
আবদুল্লাহ আল হৃদয়ঃ–
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে পূর্ব শত্রুতার জেরে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মাইকে ঘোষণা দিয়ে ও নির্দেশনা দিয়ে চালানো এই সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে স্থানীয় এক মসজিদের ইমামসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের গোয়ালনগর গ্রামে ‘বড় গোষ্ঠী’ ও ‘বাইদ্দা গোষ্ঠীর’ মধ্যে এই সংঘর্ষ শুরু হয়।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই সংঘর্ষের নেপথ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনের একটি ঘটনা। নির্বাচনের দিন গোয়ালনগর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগে বাইদ্দা গোষ্ঠীর সদস্য ও বিএনপি সমর্থক জিয়াউর রহমানকে আটক করে সেনাবাহিনী। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন। জিয়াউর রহমানের ধারণা ছিল, বড় গোষ্ঠীর শিশু মিয়া তাকে ধরিয়ে দিয়েছেন।
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জিয়াউর রহমান প্রতিশোধ নিতে শিশু মিয়াকে মারধর করেন এবং তার মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠীর মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। গত ১৭ মার্চ ইফতারের আগ মুহূর্তেও দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগের বিরোধের জেরে মঙ্গলবার সকালে বাইদ্দা গোষ্ঠীর লোকজন বড় গোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে আক্রমণের নির্দেশনা দিচ্ছে। দুই পক্ষই দা, বল্লম, টেঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষ চলাকালে পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে টেঁটাবিদ্ধ হন গোয়ালনগর স্কুলপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা হাবিবুর রহমান (৪০)। তিনি বড় গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় পার্শ্ববর্তী অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। একই সময়ে সংঘর্ষে আক্তার মিয়া নামে আরও এক ব্যক্তি নিহত হন।
নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে আসা আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বাকিরা স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
গোয়ালনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল হক চৌধুরী বলেন, “দীর্ঘদিনের পুরোনো বিরোধের জের ধরেই এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেও তাদের থামাতে পারিনি।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ মোহাম্মদ আব্দুর রউফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “পূর্ব বিরোধের জেরে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়েছে এবং এতে দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
বর্তমানে গোয়ালনগর গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।